এইচএসসি-২০২৬(hsc-2026) একনজরে তাহারেই পড়ে মনে কবিতা

তাহারেই পড়ে মনে

সুফিয়া কামাল

“হে কবি! নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়,

বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”

কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-

“দখিন দুয়ার গেছে খুলি?

বাতাবী নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?

দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”

“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম “কেন কবি আজ

এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”

কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-“অলখের পাথার বাহিয়া

তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?

ডেকেছে কি সে আমারে? -শুনি নাই,রাখিনি সন্ধান।”

কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি,

বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।”

কহিল সে মৃদু মধুস্বরে-

“নাই হ’ল, না হোক এবারে-

আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া-

রহেনি,সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।”

কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?

যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”

কহিল সে পরম হেলায়-

“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়

ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন?

মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?”

“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”

কহিলাম, “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”

কহিল সে কাছে সরে আসি-“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-

গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে

রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে | “

মূলভাবঃ

‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়| এ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাৎপর্যময় অভিব্যক্তি পেয়েছে। সাধারণভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্য মানবমনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস] বসন্ত-প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যে কবিমনে আনন্দের শিহরণ জাগাবে এবং তিনি তাকে ভাবে ছন্দে সুরে ফুটিয়ে তুলবেন সেটাই প্রত্যাশিত | কিন্তু কবি মন যদি কোনো কারণে শোকাচ্ছন্ন কিংবা বেদনা-ভারাতুর থাকে তবে বসন্ত তার সমস্ত সৌন্দর্য সত্ত্বেও কবির অন্তরকে স্পর্শ করতে পারবে না। এ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে |তাঁর সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক ওউৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে (১৯৩২) কবির জীবনে প্রচণ্ড শূন্যতা নেমে আসে৷এ ঘটনায় তাঁর ব্যক্তিজীবন ও কাব্যসাধনার ক্ষেত্রে নেমে আসে এক দুঃসহ বিষণ্ণতা | কবিমন আচ্ছন্ন হয়ে যায় রিক্ততারহাহাকারে| ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাকে আচ্ছন্ন করে আছে এই বিষাদময় রিক্ততার সুর| তাই বসন্তএলেও উদাসীন কবির অন্তর জুড়ে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা৷কবিতাটির আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর নাটকীয়তা| গঠনরীতির দিক থেকে এটি সংলাপনির্ভর কবিতার আবেগময় ভাববস্তু বিষণ্নতার সুরে এবং সুললিত ছন্দে এতই মাধুর্যমণ্ডিত যে, তা সহজেই পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যায় |

কবি-পরিচিতিঃ

নামঃ সুফিয়া কামাল
জন্মঃ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুন বরিশালে। তাঁর পৈতৃক নিবাস
কুমিল্লায়।
গ্রন্থঃ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘কেয়ার কাঁটা’, ‘উদাত্ত পৃথিবী’ ইত্যাদি
উল্লেখযোগ্য কর্মঃসাহিত্য সাধনা ও নারী আন্দোলনে ব্রতী হয়ে তিনি শুধু কবি হিসেবেই বরণীয় হননি ‘জননী’ সম্ভাষণে ভূষিত হয়েছেন।বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত
হয়েছেন
মৃত্যুঃ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *